ইরাক যুদ্ধের দুঃস্বপ্ন: ২৩ বছর পর কি আবারও একই পথে পশ্চিমারা?


ইরাক যুদ্ধের দুঃস্বপ্ন: ২৩ বছর পর কি আবারও একই পথে পশ্চিমারা?

ঢাকা, ২৩ জুন ২০২৫: ২০০৩ সালের ২০ মার্চ যখন ‘অপারেশন ফ্রিডম হান্ট’-এর নামে ইরাকের বাগদাদে স্টিলথ বোমারু দিয়ে বাঙ্কার বাস্টার বোমা ফেলা হয়েছিল, তখন তৎকালীন আমেরিকানদের মধ্যে এক অদ্ভুত গর্ব ও বিজয়ের উন্মাদনা দেখা গিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট বুশের প্রশংসায় মার্কিন সেনা ও বিমানবাহিনীর মধ্যে যেন এক ধরনের অর্গ্যাজম হবার অবস্থা ছিল, যেন এতেই তারা যুদ্ধ জিতে গেছে। গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক মহলে তখন এই হামলাকে ইরাকের বিরুদ্ধে এক decisive (সিদ্ধান্তমূলক) বিজয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, যা যেন দ্রুতই সাদ্দাম হোসেনের শাসনের অবসান ঘটাবে। কিন্তু সেই যুদ্ধ যে কেবল শুরু, তা বুঝতে তাদের সময় লেগেছিল দীর্ঘ আটটি বছর।


দীর্ঘ আট বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতা

সেই আট বছরের দীর্ঘ যুদ্ধে আমেরিকার বিপুল পরিমাণ মানবসম্পদ ও অর্থ ব্যয় হয়। হাজার হাজার মার্কিন সৈন্য প্রাণ হারায়, অনেকে গুরুতর আহত হন বা মানসিক ট্রমার শিকার হন। সামরিক খাতে খরচ হয় ট্রিলিয়ন ডলার, যা মার্কিন অর্থনীতির উপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করে। সামরিক সাফল্যের প্রাথমিক গর্ব দ্রুতই হতাশা আর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভে পরিণত হয়, যখন দেখা যায় ইরাকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অধরাই থেকে যায় এবং দেশটি চরম অস্থিতিশীলতার মুখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন সেনারা ‘নাক খন্তা’ দিয়ে বাগদাদ থেকে পালিয়ে আসে, যা কার্যত তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতার এক নির্লজ্জ নজির স্থাপন করে। সেই যুদ্ধের ভয়াবহতা এতটাই গভীরে প্রোথিত যে, মার্কিন প্রাক্তন সেনারা আজও সেই দুঃস্বপ্ন দেখে। PTSD (Post-Traumatic Stress Disorder) এবং অন্যান্য মানসিক সমস্যায় ভুগে অনেকেই সাধারণ জীবনে ফিরতে পারেননি, যা তাদের পরিবার ও সমাজের উপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।


পুনরাবৃত্তি নাকি নতুন খেলা?

আজ ২৩ বছর পর আবারও সেই “পশ্চিমা বিকারগ্রস্ততার” ছায়া দেখা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে। তবে এবার লক্ষ্য ইরাক বা কোনো আরব দেশ নয়। এবার তাদের দৃষ্টি মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী দেশ ইরানের দিকে, যারা জাতিতে আরব নয়, বরং পার্সিয়ান। ইরান ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে ইরাকের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সত্তা। তাদের নিজস্ব সভ্যতা, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং আঞ্চলিক প্রভাব রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, “খেলা সবে শুরু”। ইরাক যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে পশ্চিমারা কি আদৌ কোনো শিক্ষা নিয়েছে? নাকি, একই ধরনের সামরিক বা অর্থনৈতিক চাপের কৌশল ভিন্ন মোড়কে ইরানের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করে তারা আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দিকে এগিয়ে যেতে চাইছে? এই প্রশ্নগুলো বর্তমানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, যখন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনার পারদ চড়ছে। ইরান যদি ইরাকের মতো সামরিকভাবে দুর্বল না হয়, তবে পশ্চিমা হস্তক্ষেপের পরিণতি কী হতে পারে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জল্পনা বাড়ছে।

২০শে মার্চ ২০০৩-এর পর ইরাক যুদ্ধ প্রধানত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন বাহিনীর (United States-led coalition forces) সাথে বিভিন্ন ইরাকি পক্ষের মধ্যে হয়েছিল।

শুরুতে, কোয়ালিশন বাহিনী সাদ্দাম হোসেনের বাথপন্থী সরকারের সামরিক বাহিনী এবং তাদের অনুগত ফিদায়েইন সাদ্দাম (Saddam’s Fedayeen)-এর বিরুদ্ধে দ্রুত জয়লাভ করে। ২০০৩ সালের ৯ এপ্রিল বাগদাদের পতন এবং ১ মে প্রেসিডেন্ট বুশের “মিশন অ্যাকমপ্লিশড” ঘোষণার পর, সামরিক সংঘাতের ধরন পাল্টে যায়।


প্রধান প্রতিপক্ষরা:

সাদ্দাম হোসেনের সরকারের পতনের পর, ইরাকে একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং জটিল বিদ্রোহ (insurgency) শুরু হয়। এই বিদ্রোহে কোয়ালিশন বাহিনীর প্রধান প্রতিপক্ষরা ছিল:

  • সাদ্দামের অনুগত বাহিনী এবং বাথপন্থী অবশেষ: সাদ্দামের পতনের পরও তার অনুগত সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরা, বিশেষ করে যারা সদ্য ভেঙে দেওয়া ইরাকি সেনাবাহিনী থেকে এসেছিল, তারা প্রতিরোধ চালিয়ে যায়।
  • সুন্নি বিদ্রোহী গোষ্ঠী: ইরাকের সুন্নি জনগোষ্ঠীর মধ্যে থেকে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী গঠিত হয়, যারা মার্কিন নেতৃত্বাধীন দখলদারিত্ব এবং নতুন ইরাকি সরকারের বিরোধিতা করে। এর মধ্যে আল-কায়েদা ইন ইরাক (Al-Qaeda in Iraq – AQI) উল্লেখযোগ্য, যা পরে ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক (Islamic State of Iraq – ISI) এবং পরবর্তীতে আইএসআইএস (ISIS)-এর ভিত্তি তৈরি করে। অন্যান্য সুন্নি বিদ্রোহী গোষ্ঠী যেমন ইসলামিক আর্মি ইন ইরাক (Islamic Army in Iraq), ১৯২০ রিভোলিউশন ব্রিগেড (1920 Revolution Brigades) ইত্যাদিও সক্রিয় ছিল।
  • শিয়া মিলিশিয়া: শিয়া ধর্মীয় নেতা মুক্তাদা আল-সদরের নেতৃত্বাধীন মাহদি আর্মি (Mahdi Army) সহ বিভিন্ন শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠী মার্কিন বাহিনী এবং নতুন ইরাকি সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করে। শিয়া মিলিশিয়াদের কেউ কেউ ইরানের সমর্থন পেয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
  • আওয়াকেনিং কাউন্সিল (Awakening Councils): ২০০৬-২০০৭ সালের দিকে মার্কিন বাহিনী কিছু সুন্নি উপজাতি এবং প্রাক্তন বিদ্রোহীদের নিয়ে “আওয়াকেনিং কাউন্সিল” গঠন করে, যারা আল-কায়েদা ইন ইরাকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মার্কিন বাহিনীকে সহায়তা করেছিল। যদিও এরা মার্কিন বাহিনীর সহযোগী ছিল, তবে ইরাকের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণে তাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
  • ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনী (Iraqi Security Forces): মার্কিন এবং কোয়ালিশন বাহিনী ইরাকি সেনাবাহিনীকে পুনর্গঠিত করে এবং নতুন পুলিশ ও সামরিক বাহিনী গড়ে তোলে। এই ইরাকি বাহিনীগুলো বিদ্রোহ দমনে কোয়ালিশন বাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছে।

যুদ্ধটি মূলত একটি কাউন্টার-ইনসারজেন্সি (Counter-insurgency) অভিযান এবং একটি অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ (civil war)-এর রূপ নেয়, যেখানে একদিকে ছিল মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন ও তাদের সমর্থিত নতুন ইরাকি সরকার, আর অন্যদিকে ছিল বিভিন্ন সুন্নি ও শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী যারা একে অপরের সাথে এবং কোয়ালিশন বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করছিল। এই সংঘাত ২০১১ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন বাহিনীর আনুষ্ঠানিক প্রত্যাহার পর্যন্ত চলে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top